কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বিচ্ছিন্ন পর্যটন দ্বীপ সেন্টমার্টিনে মানবিক সেবার আড়ালে বাণিজ্য ও চরম চিকিৎসা অবহেলার এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। ‘বিনামূল্যে সুন্নতে খতনা’ ক্যাম্পের নামে চিকিৎসাগত চরম গাফিলতি, অপরিচ্ছন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার, ত্রুটিপূর্ণ সেলাই এবং ভুল ওষুধ প্রয়োগের শিকার হয়েছে শত শত শিশু। এর মধ্যে অন্তত ৫০টিরও বেশি শিশুর ক্ষতস্থানে তীব্র সংক্রমণ (ইনফেকশন) ও অনবরত রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। কয়েকজন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের জরুরি ভিত্তিতে স্পিডবোট যোগে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে প্রায় ১৫০ জনের একটি তথাকথিত ‘স্বেচ্ছাসেবী প্রতিনিধি দল’ দ্বীপে আগমন করে। তারা উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক কাজের মৌখিক অনুমতি নেয়। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর পরপরই তারা কোনো বিশেষজ্ঞ সার্জন বা ন্যূনতম চিকিৎসাগত প্রটোকল ছাড়াই শিশুদের সুন্নতে খতনা (মুসলমানি) করানোর একটি ক্যাম্প চালু করে।
শুরুতে ক্যাম্পটি সম্পূর্ণ ‘ফ্রি’ বা বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়ে মাইকিং করা হলেও, শিশুদের নিয়ে অভিভাবকেরা আসার পর শুরু হয় অর্থ আদায়। আয়োজকেরা নিয়ম করেন- প্রথম ১০০ জনের কাছ থেকে ‘টোকেন ফি’ বাবদ ১০০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি শিশুর জন্য ৭০০ টাকা হারে আদায় করা হয়। এভাবে দ্বীপে প্রায় ৩ থেকে ৫ শত নিষ্পাপ শিশুর খতনা করিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সকালেই তাড়াহুড়ো করে পুরো দলটি দ্বীপ ত্যাগ করে গা-ঢাকা দেয়।
নরকযন্ত্রণা ও অভিভাবকদের আহাজারি:
প্রতারক চক্রটি দ্বীপ ত্যাগ করার পরপরই প্রকাশ পেতে থাকে চিকিৎসার আসল ভয়াবহতা। দুপুরের পর থেকে দ্বীপে খতনা করানো শিশুদের ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা ও রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আতঙ্কিত ও দিশেহারা অভিভাবকেরা আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে সেন্টমার্টিন ২০ শয্যা হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের কোনাপাড়ার ভুক্তভোগী এক শিশুর পিতা রহমত উল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফ্রি চিকিৎসা দেবে শুনে ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু খতনা করার পর তারা জোর করে ৭০০ টাকা রেখে দেয়। আজ সকাল থেকে বাচ্চার রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না, তীব্র জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ওরা ডাক্তার নাকি কসাই আমরা জানি না! আমাদের সন্তানদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার বিচার চাই।”
আরেক ভুক্তভোগী মা ফাতেমা বেগম অশ্রুসজল চোখে বলেন, “অপরিষ্কার কাঁচি আর নোংরা সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছে। ব্যান্ডেজটাও ঠিকমতো করেনি। বাচ্চা প্রস্রাব করতে পারছে না, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখি ওই ভুয়া ডাক্তারদের কেউ নেই, সবাই পালিয়ে গেছে।”
গত ৪ অক্টোবর সেন্টমার্টিন অবকাশ রিসোর্টে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সুন্নতে খতনা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম ওই কর্মসূচিতে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২১০ শিশুর খতনা করে। পরে শিশুদের বিনামূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়।
সেন্টমার্টিন হাসপাতালের কর্তব্যরত উপসহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খতনা করানো অন্তত ৫০ জন শিশু তীব্র ইনফেকশন ও অনবরত রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারে চরম অপরিচ্ছন্নতা, নিম্নমানের সুতা এবং ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা সাধ্যমতো প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে ৩-৪ জন শিশুর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।”
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এনামুল হক বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে একটি মেডিকেল টিম দুই শতাধিক শিশুর খতনা করেছে। এর মধ্যে ৫০ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে ওই মেডিকেল টিমের দ্বীপে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনার বিষয়ে তাদের কেউ অবগত করেননি।
খতনা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা মৌলভী জুবাইর বলেন, আমাদের এলাকায় খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশু রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আতংকিত হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। কারণ, দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারই অসচ্ছল। কোনো শিশুর বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিলে তাদের উন্নত চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শিশুদের অসুস্থতার কারণ কী এবং চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, খতনা করানোর পর বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল টিমের গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।